
মতলব উত্তর উপজেলায় কলেজশিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই পরিচালনা নিয়ে নতুন করে ভাবার তাগিদ দিয়েছেন ডা. দেওয়ান ইমদাদুল হক। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল ও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক লেখায় ডা. দেওয়ান ইমদাদুল হক উল্লেখ করেন, চলতি বছর মতলব উত্তর উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ৬৫৭ জন শিক্ষার্থী। অথচ উপজেলার ১০টি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১১৩ জন।
বিভাগভিত্তিক তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করেছে ৯২৫ জন শিক্ষার্থী। বিপরীতে স্থানীয় কলেজগুলোতে এ বিভাগে ভর্তি হয়েছে মাত্র ২১৫ জন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে পাস করেছে ৩৭০ জন, আর এ বিভাগে ভর্তি হয়েছে ২২১ জন। অন্যদিকে মানবিক বিভাগ থেকে পাস করেছে ৩৬২ জন শিক্ষার্থী, অথচ এ বিভাগে ভর্তি হয়েছে ৬৭৭ জন।
তাঁর মতে, এসব পরিসংখ্যান স্থানীয় কলেজগুলোতে বিভাগভিত্তিক শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অসমতার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে স্থানীয় কলেজে ভর্তির সংখ্যা তুলনামূলক কম। অন্যদিকে মানবিক বিভাগে ভর্তির সংখ্যা এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যার চেয়ে বেশি। এ পরিস্থিতির পেছনে শিক্ষার্থীদের কলেজ নির্বাচন, বিভাগ পরিবর্তন এবং অন্যান্য এলাকা থেকে শিক্ষার্থী ভর্তির মতো বিষয় থাকতে পারে।
তবে শুধু এসব পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কতজন শিক্ষার্থী উপজেলার বাইরে চলে গেছে কিংবা বাইরে থেকে এসে ভর্তি হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি স্পষ্ট করতে কলেজভিত্তিক ও বিভাগভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ভর্তি তথ্য বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কম শিক্ষার্থীসংখ্যার কলেজ নিয়ে উদ্বেগ
লেখায় আরও উল্লেখ করা হয়, শরীফ উল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজে মাত্র ৬ জন, দ্য কার্টার একাডেমিতে ২৫ জন এবং সুজাতপুর কলেজে ৫৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। তুলনামূলক কম শিক্ষার্থী নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, শিক্ষার পরিবেশ এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি।
ডা. দেওয়ান ইমদাদুল হকের মতে, নতুন নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান কলেজগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, বিজ্ঞানাগার ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্থানীয় কলেজে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কম শিক্ষার্থীসংখ্যার কলেজগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন কিংবা বাস্তবসম্মত পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
যৌথ পর্যালোচনা সভার আহ্বান
মতলব উত্তরের কলেজশিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা কর্মকর্তা, কলেজ কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি যৌথ পর্যালোচনা সভা আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, এ সভায় কলেজভিত্তিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই পরিচালনার জন্য বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে প্রতিটি কলেজের শিক্ষকসংখ্যা, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল, বিভাগভিত্তিক ভর্তি, শিক্ষা উপকরণ এবং আর্থিক সক্ষমতার মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কেন স্থানীয় কলেজের পরিবর্তে অন্যত্র ভর্তি হতে আগ্রহী হচ্ছে, সেটিও অনুসন্ধান করা জরুরি।
সংখ্যা নয়, মানসম্মত শিক্ষাই হোক অগ্রাধিকার
শিক্ষা একটি এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই কলেজের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
ডা. দেওয়ান ইমদাদুল হকের বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো, মতলব উত্তর উপজেলায় কলেজশিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া গেলে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ভালো শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
শুধু কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং মানসম্মত, শিক্ষার্থীবান্ধব ও টেকসই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই হোক মতলব উত্তরের সম্মিলিত অগ্রাধিকার—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।




